• বৃহস্পতিবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ||

  • আশ্বিন ১৩ ১৪৩০

  • || ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৫

দৈনিক খাগড়াছড়ি

চাকরি ও বিয়ের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ-পাচার করা হচ্ছে পাহাড়ি তরুণীদের

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৩  

ছবি- সংগৃহীত।

ছবি- সংগৃহীত।

গত ২৭ আগষ্ট রোববার রাজধানী ঢাকার উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টর থেকে জি সেন (৫৮) নামের এক চীনা নাগরিক এবং তার সহযোগী হীরা চাকমা (২৫)কে আটক করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। চীনে নিয়ে গিয়ে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে বলে এক এক চাকমা তরুণীকে দুদিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী কলেজছাত্রীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা মিলেছে। গ্রেপ্তার দুজন বর্তমানে কারাগারে।

গণমাধ্যম বলছে, ওই ছাত্রী সরকারি একটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বর্ষে পড়েন। পাশাপাশি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ করেন। গ্রেপ্তার চীনের নাগরিক জি সেনের সহযোগী হীরা চাকমার সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় কলেজছাত্রীর। তাকে চীনে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন হীরা চাকমা। ফাঁদে ফেলে গত ২৫ আগষ্ট শুক্রবার রাতে জি সেনের উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের বাসায় নিয়ে যান হীরা চাকমা। সেদিন কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করেন জি সেন। ওই ছাত্রী বাসা থেকে চলে যেতে চাইলে জি সেনের সঙ্গে বিয়ের কথা বলা হয়। পরদিন একই কথা বলে আবারও ধর্ষণ করা হয় তাকে। 

ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী চাকমা সম্প্রদায়ের। অপরদিকে চীনা নাগরিককে ধর্ষনে সহায়তাকারী হীরা চাকমাও একই সম্প্রদায়ের। হীরা চাকমা রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার করেঙ্গাতলী সি ব্লক এলাকার বিরলাল চাকমার মেয়ে। 

এ তো গেল সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিবরণ। আদতে, স্বজাতি স্বার্থান্বেষী কিছু লোকের লোভের স্বীকার হয়ে প্রতিবছর বহু সংখ্যক পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের নারীদের বিয়ে ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয় চীন ও থাইল্যান্ডসহ নানা দেশে। এছাড়া বিয়ের প্রলোভর দেখিয়ে করা হয় ধর্ষণও। প্রাথমিক যোগাযোগের পর চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে বিয়ের পর চীনে নিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরই তাদেরকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অন্ধকার জগতে বিক্রি করে দিচ্ছে। উন্নত জীবনের আশায় মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে পার্বত্য জেলার মেয়েরা পাচারের শিকার হচ্ছেন। আর এসব কাজে পাচারকারীদের সর্বাত্নক সহায়তাও করছে পাহাড়িদের একটি চক্র। স্বজাতিদের কথায় সহজে বিশ্বাস করে বিপদে পড়ছেন পাহাড়ি তরুণীরা।

২০১৮ সালে চাঞ্চল্যকর সুর্বণা চাকমার ঘটনাটিও বলা যায় উদাহরণসরূপ। সেবছর খাগড়াছড়ির সুর্বণা চাকমা (২৩) নামের এক মেয়েকে পাচারকালে চীন নাগরিকসহ তিনজনকে ডিবি পুলিশের গ্রেফতারের পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসে। সেসময় ভুক্তভোগী সুবর্ণা চাকমা জানান, ‘দরিদ্রতার কারণে চাকরি খুঁজছিলাম। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে আছাফুন নাহার লিপির সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে চীনে ভালো চাকরি দেয়ার কথা বলে উত্তরার একটি ম্যারেজ মিডিয়াতে নিয়ে আসে। পরে বুঝতে পেরে বিষয়টি পরিবারকে জানালে উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর রোডের ৬৮ নম্বর বাড়ির ৬ তলা থেকে ডিবি আমাকে উদ্ধার করে।’ সঙ্গে গ্রেফতার করে এক চীনা নাগরিকসহ ৩ জনকে। 

২০১৮ সালের জানুয়ারি রাঙামাটিতে ভ্রমণে আসেন এক চীনা তরুণ। এক সপ্তাহের মধ্যে পাহাড়ি সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে সখ্যতা করেন পাহাড়ি বাঙালিদের সঙ্গে। বন্ধুত্ব করেন পাহাড়ি অল্প শিক্ষিত তরুণীদের সঙ্গে। হঠাৎ এক তরুণীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন তিনি। বিয়ে করে চীনে নিয়ে যাবে-এমন প্রস্তাবে রাজি হয় তরুণীর পরিবার। উন্নত জীবনের আশায় বিয়ে করেন ওই তরুণী। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে চীনে চলে যান তারা। এরপর পরিণতি ভয়ঙ্কর! 

এক হিসাবে তথ্য পাওয়া গেছে, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ মাসে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের কমপক্ষে ১৭ জন পাহাড়ি তরুণীকে বিয়ে করেছিল বেড়াতে আসা চীনা নাগরিকরা। এরপর তাদের নিয়ে গেছে চীনে। এসব তরুণীদের সবাই অল্প শিক্ষিত। ৯ম শ্রেণি থেকে এসএসসি পাস। সহজ-সরল এসব দরিদ্র পাহাড়ি মেয়েদের এভাবে বিয়ের ফাঁদে ফেলে পাচার করা হচ্ছে চীনে। চীনে নিয়ে ৩-৪ মাস সংসার করার পর পতিতালয়ে বিক্রি করা হচ্ছে তাদের। অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড়ি মেয়েদের।

মূলত রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের মেয়েরাই তাদের টার্গেট। তাদেরকে সহজেই বুঝিয়ে চীনাদের সঙ্গে বিয়েতে রাজি করানো হয়। এমনকি তারা কৌশলে পাচারের শিকার মেয়েদের দিয়ে প্রতিবেশী নারী ও স্বজনদের ফোন করিয়ে তাদের প্রলুব্ধ করেন। নানাভাবে তাদেরকে লোভ দেখানো হয়। এভাবেই তাদেরকে ফাঁদে ফেলা হয়। এর আগে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা বিয়ের জন্য লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে যেত। পরে সে দেশের সরকার বিদেশিদের বিয়ে করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে তারা বাংলাদেশমুখী হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সহজ-সরল, অল্প শিক্ষিত তরুণীদের পাচার ও ধর্ষনের মতো ঘটনায় নিরব তাদেরই স্বগোত্রীয় পাহাড়ি অধিকার আদায়ের সংগঠনগুলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছোট-খাট ইস্যুকে রং দিয়ে সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরী করার কারিগর এসব সংগঠনকে কখনোই নিজেদের সম্প্রদায়ের তরুণীদের এসব পাচার বা ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায় নি। অধিকার আদায়ের কথা বলে গত ৫০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত ও অনিরাপদ করে তোলা এসব সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নিজেদের সম্প্রদায়ের মেয়েদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের। বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে ধর্ম ত্যাগ করা বা বাঙালিদের সাথে কথা বলার অপরাধে বহু পাহাড়ি তরুণীকে এসব আঞ্চলিক সংগঠনের আক্রোশের বলি হতে হয়েছে। অনেককে অপহরণের পর আর হদিন মেলেনি। 

সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে নারী অধিকারের কথা বলা পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ কিংবা হিল উইমেনস ফেডারেশনও এসব আঞ্চলিক দলেরই একাংশ হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি তরুণীদের অধিকার রক্ষায় তাদের কোন ভূমিকা চোখে না পড়লে পাহাড়ের অন্যান্য ঘটনা উসকে দিয়ে পাহাড় অশান্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত তারা।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]