• মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১২ ১৪২৯

  • || ২৯ সফর ১৪৪৪

দৈনিক খাগড়াছড়ি

কেন খোলনলচে বদলে ফেলেছিল গণমাধ্যম?

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২২  

ছবি- সংগৃহীত।

ছবি- সংগৃহীত।

কবি শহীদ কাদরীর ‘হন্তারকদের প্রতি’ কবিতায় লেখা—

‘বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোন উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না।

তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম,
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিল,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলাভাষা।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘাতকরা পরিচিত। বাংলার মাটি থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শেখ মুজিবুর রহমানের নাম চিরতরে মুছে ফেলা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কেবল সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা থামেননি, আগস্ট ১৯৭৫ সালের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রচারমাধ্যম থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা-রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের কোনও প্রচারমাধ্যম, এমনকি চলচ্চিত্রেও তার নাম বা ছবি প্রকাশ হতে দেখা যায়নি।

১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার এক বছর পরের ঐতিহাসিক জাতীয় জীবন। পত্রিকার পাতায় নেই বঙ্গবন্ধুর কোনও ছবি, নেই ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেওয়া সেই ভাষণের কোনও উল্লেখ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরের বছরগুলোয় কোনও জাতীয় দিবসেও ছিল না কোথাও বঙ্গবন্ধুর নাম। ১৯৭৬ থেকে দেশে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের কোনও উল্লেখ, বঙ্গবন্ধুর অবদান বা আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে কোনও উল্লেখ নেই।

কেন হয়েছিল এমন? সামরিক শাসকদের কোনও নির্দেশনায় নাকি গণমাধ্যম নিজে থেকেই সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল? তৎকালীন ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকরা বলছেন, শেখ মুজিবকে হত্যার পর এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা নানাভাবে ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। শেখ মুজিবকে হত্যার পর পর ভোরবেলায় শাহবাগের বাংলাদেশ বেতারের ব্রডকাস্ট শাখা থেকে হত্যাকাণ্ড, সেই সঙ্গে সামরিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিল। কোনও সরাসরি বা লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। খোদ সামরিক শাসন জারিটাই যথেষ্ট ছিল।

সে সময় সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ও বর্তমানের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত বলেন, ‘গণমাধ্যমকে আলাদা কোনও বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। আমরা ভুলে যাই, সময়টা সামরিক শাসনের। আমরা কেন সেই সময়টায় বারবার মিডিয়ার বদলে যাওয়ার দিকে মনোযোগ দেই। যারা মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে নিলো তাদের কথা শুনলে যা করতে হয়, মিডিয়া তাই করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল সেটা সামাল দিয়ে কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবাদ করবে এমন মানুষ তখন পাওয়া যায়নি।’

লিখিত কোনও নির্দেশনা ঘাতক শাসকের কাছ থেকে গণমাধ্যম পেয়েছিল কিনা প্রশ্নে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন বলেন, রাতারাতি বদলে গেলো সব। জয় বাংলা বদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ হলো। লিখিত কোনও কিছু ছিল না হয়তো। তারপরেও এক ধরনের নির্দেশনা ছিল। সে সময় সিনেমা থেকেও নাম মুছে ফেলা হতো। একেবারে লেখা যায়নি তা না। পরে এরশাদের সময় প্রথমবারের মতো পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হয়। এও ঠিক, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরে তার বরাত দিয়ে কাগজগুলোতে ‘বঙ্গবন্ধু’ লেখা হতো। সে সময় কেউ কেউ লেখার চেষ্টা করেছেন। সন্তোষ গুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরা নানা সময়ে লিখেছেন। সংবাদ পত্রিকা কিছু লেখা ছাপতো।

‘কোনও লিখিত নির্দেশনা ছিল না’ উল্লেখ করে তৎকালীন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা ও বর্তমানে কালবেলা পত্রিকার সম্পাদক আবেদ খান বলেন, হত্যা সংঘটনের পরে বেতার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যে পদ্ধতিতে ঘাতকেরা জাতির সামনে হাজির হয়েছিল, গণমাধ্যম তার পথচলার ধরন তখনই ঠিক করে নেয়। এমনিতেই তখন সংখ্যাগত দিক থেকে অনেক কম ছিল। তারপরেও কামাল লোহানীর মতো সাংবাদিকরা নানাভাবে সক্রিয় থাকতে চেষ্টা করেছেন। আর কিছু সাংবাদিক যারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর কাছের লোক বলে প্রদর্শন করতো, তারা রাতারাতি পল্টি খেয়েছিল।

নির্দেশনার ধরন যেমন ছিল

ওই সময় বাংলাদেশ বেতারের ঢাকা কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন আশফাকুর রহমান খান। তিনি সাক্ষ্য প্রদানকালে জানিয়েছিলেন, ১৫ আগস্ট বেতার ভবনে আসতেই তাকে ইন্টারকমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ডেকে পাঠায় মেজর শাহরিয়ার। তিনি গিয়ে দেখেন অল্প বয়সী ওই সেনা কর্মকর্তা টেবিলের ওপরে স্টেনগান রেখে বসে আছে। মেজর শাহরিয়ার তখন তাকে বেতারের নতুন ‘পলিসি’ কী হবে সে নিয়ে নির্দেশনা দেয়, যাতে ছিল, বেতারের নাম হবে ‘রেডিও বাংলাদেশ’; বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার ইত্যাদি উচ্চারণ করা যাবে না; শেখ মুজিব সংক্রান্ত কোনও তথ্য প্রচার করা যাবে না; অনুষ্ঠানসূচির অনুমোদন নিতে হবে; গান-বাজনাসহ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বেশি প্রচার করতে হবে। এসবই করা হয়েছিল যাতে দেশের জনগণ মনে করে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টি স্বাভাবিক।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]