• শনিবার   ২৫ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১২ ১৪২৯

  • || ২৫ জ্বিলকদ ১৪৪৩

দৈনিক খাগড়াছড়ি

সন্তু লারমা ও প্রসীত খীসার স্বার্থের দ্বন্দ্ব উত্তাপ ছড়ায় পাহাড়ে

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২২  

ছবি- দৈনিক খাগড়াছড়ি।

ছবি- দৈনিক খাগড়াছড়ি।

ফের গুরু জ্যোতিরিদ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমার জেএসএস ও শিষ্য প্রসীত বিকাশ খীসার ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘাতে পাহাড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

টানা প্রায় পাঁচ বছর সাবেক গেলিরা নেতা আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তারই শিষ্য প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) -এর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি ছিল। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সংঘাত হয়নি। কিন্তু ইউপিডিএফ  সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাচ্ছে এমন খবরে চরম ক্ষেপেছেন সন্তু লামরা। হামলা করেছেন ইউপিডিএফের একাধিক আস্তানায়। হতাহতও হয়েছে বেশ কয়েকজন।

শনিবার (১১ জুন) দুপুরে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে ইউপিডিএফের উপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।

প্রায় দুই দশকের সংঘাত বন্ধে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফ্রেরুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার অস্ত্র সমর্পনের মধ্য দিয়ে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু ঐ দিনই খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে চুক্তির প্রত্যাখান করে কালো পতাকা উত্তোলন করে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে সে সময়কার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীরা।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্ত্ব শাসনের দাবিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। শুরু হয় সন্তু ও প্রসীতের নেতৃত্বে দুই সংগঠনের আধিপত্য রক্ষার লড়াই। এ লড়াইয়ে নিহত হন বহু মানুয়।

ইউপিডিএফ গঠিত হওয়ায় পাহাড়ের মানুষ এক পক্ষের চাঁদাবাজি থেকে পড়ে যায় দ্বিমুখী চাঁদাবাজির মুখে। অপর দিকে ২০০৮ সালে জেএসএস ভেঙে সুধা সিন্দু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস (এমএন) গ্রুপ। শুরু হয় ত্রিমুখী সংঘাত। কখনও জেএসএস (সন্তু)-ইউপিডিএফ (প্রসীত), আবার কখনও জেএসএস (সন্তু)-জেএসএস (এমএন)।

২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে প্রসীতের নেতৃত্ব প্রত্যাখান করে তপন কান্তি চাকমা বর্মা-কে আহবায়ক ও সদস্য সচিব জলেয়া চাকমা তরু-কে সদস্য সচিব করে ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) নামে পাল্টা সংগঠনের জন্ম হয়। ফলে পাহাড়ে শুরু হয় চার পাহাড়ি সংগঠনের সশস্ত্র তৎপরতা।

একটি সূত্র জানায়, ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গঠনের পর আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(জেএসএস) ও তারই শিষ্য প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর সমঝোতা হয়। উদ্দেশ্য জেএসএস (এসএন লারমা) ইউপিডিএফ গণতন্ত্রিককে ঘায়েল করা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন হয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষ। অপহৃত হয়েছে অন্তত ২ হাজার ৬২৬ জন। নিহতের তালিকায় সামরিক বাহিনীর সদস্য ও জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীও রয়েছে।

একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, ২০১৫-১৬ সালের ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সমঝোতা চুক্তি হয়। সমঝোতা চুক্তির শর্ত ছিল একে অপরের সাংগঠনিক এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে না। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক বছর যাবত জেএসএস (সন্তু) দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ইউপিডিএফ (প্রসীত) দলের সাংগঠনিক এলাকায় অবস্থান করে আসছে। এ নিয়ে দু’দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রেষারেষি ছিল।

এদিকে চলতি মাসের  ৯ জুন ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপ সরকারের মধ্যস্থতাকারী মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলামের কাছে চুক্তি আকারে তাদের ৬৬পৃষ্ঠার ৮৭টি দাবিনামা পেশ করেন। এ নিয়ে জেএসএস (সন্তু) ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।

এ নিয়ে ১০জুন সন্তু লারমার জেএসএস ও প্রসীতের ইউপিডিএফেরও বৈঠক হয়। কিন্তু বৈঠক কোনো সুরাহা ছাড়া শেষ হয়। বৈঠকের পরদিন শনিবার (১১ জুন) ভোর রাতে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির খারানসিং কার্বারী পাড়া ও দীঘিনালার লাড়াইছড়িতে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের আস্তানাগুলোতে সন্তুর জেএসএস হামলা চালায়। উভয়ের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এতে উভয় পক্ষের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু নেতা হতাহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হতাহতের খবর ফলাও করে প্রকাশ হলেও বিষয়টি নিশ্চিত করেনি স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর পর সন্তু লামরার জেএসএস ও প্রসীতের ইউপিডিএফ ফের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় পাহাড়জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক  ছড়িয়ে পড়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]