• মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১২ ১৪২৯

  • || ২৯ সফর ১৪৪৪

দৈনিক খাগড়াছড়ি

কাঁথায় মুড়িয়ে খাতাগুলো নেন শেখ হাসিনা

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২২  

অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও রোজনামচা গ্রন্থের প্রচ্ছদ

অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও রোজনামচা গ্রন্থের প্রচ্ছদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ দেশ সৃষ্টির ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য সামনে এসেছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুটিতে। এই দুটি গ্রন্থ দেশের ইতিহাসের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী ও কর্মময় জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছে নতুন প্রজন্মকে। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের তিন যুগ পর ২০১২ সালের জুনে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ২০১৭ সালের মার্চে ‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশ করা খুব সহজ ছিল না। দেশের জন্য অমূল্য এ বই দুটির পান্ডুলিপি সংরক্ষণ ও উদ্ধার করে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়াটা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চোখকে ফাঁকি নিয়ে পিতার লেখার খাতা উদ্ধারে কৌশলী হতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে। সংরক্ষণ করতে হয়েছে মুরগির খোপের মধ্যেও। চার দশকেরও আগে লেখা এবং দীর্ঘদিন অরক্ষিত এই খাতাগুলোর পাঠোদ্ধারেও বেগ পেতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাসহ মুদ্রণ সংশ্লিষ্টদের। একটি শব্দ বা বাক্য উদ্ধারে বারবার পড়তে হয়েছে। পাঠোদ্ধারে ম্যাগনিফাইং গ্লাসও ব্যবহার করতে হয়েছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিসহ জাতির পিতার স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত অজস্র দলিলপত্র ও নথি একদা পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল— তার প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশে। প্রথমবার তা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে, তারা ২৬ মার্চ আবারও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাঁর বাসভবন লুণ্ঠন করে। হয়তো তাঁর লেখা আত্মজীবনীর কাগজপত্রগুলো তাদের কাছে ততটা মূল্যবান মনে হয়নি, সেজন্য সেগুলো তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে গিয়েছিল। শত্রু কবলিত সেই বাড়িটি থেকে বিরাট ঝুঁকি নিয়ে শেখ জামাল, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলের সঙ্গী হয়ে সেই রুলটানা খাতাগুলো উদ্ধার করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ওই বাড়িটি থেকে পিতার লেখা খাতাগুলোর আংশিক উদ্ধার করেন শেখ হাসিনা। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার পর এক ফুফাতো ভাইয়ের মাধ্যমেও শেখ হাসিনা হাতে পান পিতার হাতের লেখা এই অমূল্য আত্মজীবনীর চারখানা খাতা। শেখ হাসিনা পিতার লেখা খাতাগুলো উদ্ধার, সংরক্ষণ ও তা বই আকারে প্রকাশের স্মৃতিচারণ করেছেন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’র ভূমিকায়–

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর বাসায় গৃহবন্দি থাকার সময় দুই ভাই শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এবং বোন শেখ রেহানার পড়ার বইগুলো আনতে পাকিস্তানি মিলিটারিদের প্রহরায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে যান শেখ হাসিনা। যাওয়ার সময় মা ফজিলাতুন নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর লেখা খাতাগুলো নিয়ে আসার কথা বলেন। শেখ হাসিনার ভাষায়— আমার মা আমাকে বললেন, ‘একবার যেতে পারলে আর কিছু না হোক, তোর আব্বার লেখা খাতাগুলো যেভাবে পারিস নিয়ে আসিস।’ খাতাগুলো মায়ের ঘরে কোথায় রাখা আছে, তাও বলে দিলেন। আমাদের সঙ্গে মিলিটারির দুটি গাড়ি, ভারী অস্ত্রসহ পাহারাদার গেলো।

শেখ হাসিনা লিখেছেন, তারা ঢুকে দেখেন— সমস্ত বাড়িতে লুটপাটের চিহ্ন, সব আলমারি খোলা, জিনিসপত্র ছড়ানো-ছিটানো। বাথরুমের বেসিন ভাঙা, কাচের টুকরা ছড়ানোসহ বীভৎস দৃশ্য। তিনি আরও লিখেছেন, ‘বইয়ের শেলফে কোনও বই নাই। অনেক বই মাটিতে ছড়ানো, সবই ছেঁড়া অথবা লুট হয়েছে। কিছু তো নিতেই হবে। আমরা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাই, পাকিস্তান মিলিটারি আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যায়। ভাই-বোনদের বললাম, যা পাও বইপত্র হাতে হাতে নিয়ে নাও। আমি মায়ের কথামতো জায়গায় গেলাম। ড্রেসিং রুমের আলমারির ওপর ডানদিকে আব্বার খাতাগুলো রাখা ছিল, খাতা পেলাম কিন্তু সাথে মিলিটারির লোক, কী করি? যদি দেখার নাম করে নিয়ে নেয়, সেই ভয় হলো। যাহোক, অন্য বই-খাতা কিছু হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে একখানা গায়ে দেবার কাঁথা পড়ে থাকতে দেখলাম, সেই কাঁথাখানা হাতে নিলাম, তারপর এক ফাঁকে খাতাগুলো ওই কাঁথায় মুড়িয়ে নিলাম।’

‘আমার মায়ের হাতে সাজানো বাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখে বারবার চোখে পানি আসছিল। কিন্তু নিজেকে শক্ত করলাম। খাতাগুলো পেয়েছি এটুকুই বড় সান্ত্বনা।’

বন্দিদশার ওই বাড়িতে ফিরে তিনি মায়ের হাতে খাতাগুলো তুলে দেন। পিতার লেখা এই খাতা উদ্ধার তার মায়ের প্রেরণা ও অনুরাধের ফসল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি সেনারা সমস্ত বাড়ি লুটপাট করেছে, তবে রুলটানা এই খাতাগুলোকে গুরুত্ব দেয়নি বলেই খাতাগুলো পড়েছিল।’

মায়ের প্রেরণায় পিতা মুজিব তাঁর জীবনের স্মৃতি লিখেছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার আব্বা যতবার জেলে যেতেন মা খাতা, কলম দিতেন লেখার জন্য। বারবার তাগাদা দিতেন। আমার আব্বা যখন জেল থেকে মুক্তি পেতেন, মা সোজা জেল গেটে যেতেন আব্বাকে আনতে। আর আব্বার লেখাগুলো যেন আসে তা নিশ্চিত করতেন। সেগুলো অতি যত্নে সংরক্ষণ করতেন।’ অবশ্য বঙ্গবন্ধুও অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, স্ত্রীর উৎসাহে তিনি লিখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে ওই খাতাগুলো সংরক্ষণের বিষয়ে শেখ হাসিনা কারাগারের রোজনামচার ভূমিকায় লিখেছেন, ‘ঢাকার আরামবাগে আমার ফুফাতো বোন মাখন আপা থাকতেন। তার স্বামী মীর আশরাফ আলী, আব্বার সঙ্গে কলকাতা থেকেই রাজনীতি করতেন, যেভাবেই হোক তার কাছেই পাঠাবো সিদ্ধান্ত নিলাম। অবশেষে অনেক কষ্ট করে তার কাছে পাঠালাম। আমার বিশ্বাস, তিনি যত্ন করে রাখবেন। আমার ফুফাতো বোন পলিথিন ও ছালার চট দিয়ে খাতাগুলো বেঁধে তার মুরগির ঘরের ভেতরে চালের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, যাতে কখনও কেউ বুঝতে না পারে। কারণ, পাকিস্তানি আর্মি সবসময় হঠাৎ হঠাৎ যেকোনও বাড়ি সার্চ করতো। তবে ওই বাড়ির সুবিধা ছিল যে, আরামবাগ গলির ভেতর গাড়ি ঢুকতে পারতো না। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পর সেই খাতাগুলো আমার বোন ও দুলাভাই মায়ের হাতে পৌঁছে দেন। বৃষ্টির পানিতে কিছু নষ্ট হলেও মূল খাতাগুলো মোটামুটি ঠিক ছিল।’

জাতির পিতাকে হত্যার পর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে খাতাগুলো দ্বিতীয়বার উদ্ধারের ঘটনা বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। আমি ও আমার ছোট বোন রেহানা দেশের বাইরে ছিলাম। ৬ বছর বাংলাদেশে ফিরতে পারিনি। ১৯৮১ সালে যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে, আমি অনেক বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে দেশে ফিরে আসি। দেশে আসার পর আমাকে বিএনপি সরকার আমাদের এই বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। বাড়ির গেটের সামনে রাস্তার ওপর বসে মিলাদ পড়ি। মে মাসের ৩০ তারিখ জিয়ার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর ১২ জুন বাড়িটা আমার হাতে হস্তান্তর করে। প্রথমে ঢুকতে পা থেমে গিয়েছিল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন আমার পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে আসে, তখন আমার মনে পড়ে— আব্বার লেখা খাতার কথা, আমি হেঁটে আব্বার শোবার ঘরে ঢুকি। ড্রেসিং রুমে রাখা আলমারির দক্ষিণ দিকে হাত বাড়াই। ধূলিধূসর বাড়ি। মাকড়সার জালে ভরা। তার মাঝেই খুঁজে পাই অনেক আকাঙ্ক্ষিত রুলটানা খাতাগুলো। আমি শুধু খাতাগুলো হাতে তুলে নিই। আব্বার লেখা ডায়েরি, মায়ের বাজার ও সংসার খরচের হিসাবের খাতা।’

‘আব্বার লেখাগুলো পেয়েছিলাম এটাই আমার সব থেকে বড় পাওয়া, সব হারাবার ব্যথা বুকে নিয়ে এই বাড়িতে একমাত্র পাওয়া ছিল এই খাতাগুলো। খুলনায় চাচির বাসায় খাতাগুলো রেখে আসি, চাচির ভাই রবি মামাকে দায়িত্ব দেই। কারণ, ঢাকায় আমার কোনও থাকার জায়গা ছিল না। কখনও ছোট ফুফুর বাসা, কখনও মেজো ফুফুর বাসায় থাকতাম।’

১৯৮১ সালের ১২ জুন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে পিতার লেখাগুলোর আংশিক পাওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘তখন আব্বার লেখা স্মৃতিকথা, ডায়েরি ও চীন ভ্রমণের খাতাগুলো পাই। আত্মজীবনী লেখা খাতাগুলো পাইনি। কিছু টাইপ করা কাগজ পাই— যা উইপোকা খেয়ে ফেলেছে। ফুলস্কেপ পেপারের অর্ধেক অংশই নেই, শুধু ওপরের অংশ আছে। এসব অংশ পড়ে বোঝা যাচ্ছিল যে এটি আব্বার আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি, কিন্তু যেহেতু অর্ধেকটা নাই সেহেতু কোনও কাজেই আসবে না। এরপর অনেক খোঁজ করেছি। মূল খাতা কোথায় কার কাছে আছে, জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনও লাভ হয় নাই। একপর্যায়ে এগুলোর আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।’

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সেই রুলটানা মূল খাতাগুলো হাতে পাওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। আমি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যাই। এ ঘটনার পর শোক-কষ্ট-বেদনায় যখন জর্জরিত, ঠিক তখন আমার কাছে এই খাতাগুলো এসে পৌঁছায়। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। এত দুঃখ-কষ্ট বেদনার মধ্যেও যেন একটু আলোর ঝলকানি। আমি ২১ আগস্ট মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। মনে হয় যেন নতুন জন্ম হয়েছে। আর সে সময় আমার হাতে এলো আব্বার হাতের লেখা এই অমূল্য আত্মজীবনীর চারখানা খাতা! শেষ পর্যন্ত এই খাতাগুলো আমার এক ফুফাতো ভাই এনে আমাকে দিলো। আমার আরেক ফুফাতো ভাই বাংলার বাণী সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণির অফিসের টেবিলের ড্রয়ার থেকে সে এই খাতাগুলো পেয়েছিল। সম্ভবত আব্বা শেখ মণিকে টাইপ করতে দিয়েছিলেন, আত্মজীবনী ছাপাবেন এই চিন্তা করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনিও শাহাদাতবরণ করায় তা করতে পারেননি। কাজটা অসমাপ্ত রয়ে যায়।’

‘খাতাগুলো হাতে পেয়ে আমি তো প্রায় বাকরুদ্ধ। এই হাতের লেখা আমার অতি চেনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে ডাকলাম। দুই বোন চোখের পানিতে ভাসলাম। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পিতার স্পর্শ অনুভব করার চেষ্টা করলাম। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি, তারপরই এই প্রাপ্তি। মনে হলো যেন পিতার আশীর্বাদের পরশ পাচ্ছি। আমার যে এখনও দেশের মানুষের জন্য, সেই মানুষ, যারা আমার পিতার ভাষায় বাংলার দুঃখী মানুষ, সেই দুঃখী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ বাকি, তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজ বাকি, সেই বার্তাই যেন আমাকে পৌঁছে দিচ্ছেন। যখন খাতাগুলোর পাতা উল্টাছিলাম আর হাতের লেখাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিলাম, আমার কেবলই মনে হচ্ছিল— আব্বা আমাকে যেন বলছেন, ভয় নেই মা, আমি আছি, তুই এগিয়ে যা, সাহস রাখ। আমার মনে হচ্ছিল, আল্লাহর তরফ থেকে ঐশ্বরিক অভয়বাণী এসে পৌঁছালো আমার কাছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খাতাগুলো নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। খাতাগুলোর পাতা হলুদ, জীর্ণ ও খুবই নরম হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় লেখাগুলো এত ঝাপসা যে পড়া খুবই কঠিন। একটা খাতার মাঝখানে কয়েকটা পাতা একেবারেই নষ্ট, পাঠোদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। পরদিন আমি, বেবী মওদুদ ও রেহানা কাজ শুরু করলাম। রেহানা খুব ভেঙে পড়ে যখন খাতাগুলো পড়তে চেষ্টা করে। ওর কান্না বাঁধ মানে না। প্রথম কয়েক মাস আমারও এমন হয়েছিল, যখন স্মৃতিকথা ও ডায়েরি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। ধীরে ধীরে মনকে শক্ত করেছি। প্রথমে খাতাগুলো ফটোকপি করলাম। খুবই সাবধানে কপি করতে হয়েছে। একটু বেশি নাড়াচাড়া করলেই পাতা ছিঁড়ে যায়। এরপর মূল খাতা থেকে আমি ও বেবী পালা করে রিডিং পড়েছি, আর মনিরুন নেছা নিনু কম্পোজ করেছে। কোথাও কোথাও লেখার পাঠ অস্পষ্ট। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে চারখানা খাতার সবটুকু লেখাই কম্পিউটারে কম্পোজ করা হয়েছে। খাতাগুলোতে জেলারের স্বাক্ষর দেওয়া অনুমোদনের পৃষ্ঠা ঠিকমতো আছে। তাতে সময়টা জানা যায়।’

শেখ হাসিনা আরও উল্লেখ করেন, ‘এরপর আমি ও বেবী মওদুদ মূল খাতার সঙ্গে মিলিয়ে পড়ে সম্পাদনা ও সংশোধনের কাজটা প্রথমে শেষ করি। তারপর অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের সঙ্গে আমি ও বেবী মওদুদ পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা, প্রুফ দেখা, টিকা লেখা, স্ক্যান, ছবি নির্বাচন ইত্যাদি যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করি। শেখ রেহানা আমাদের এসব কাজে অংশ নিয়ে সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করে।’

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পঠিত একটি বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ জাতিসংঘের দাফতরিক ছয়টি ভাষাসহ বিশ্বের ১৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর ব্রেইল সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। অপরদিকে, ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি তিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]