• রোববার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২১ ১৪২৮

  • || ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

দৈনিক খাগড়াছড়ি

ক্ষমতা হস্তান্তরের তাগিদ দিয়ে চিঠি: এক পৌর মেয়রের অনন্য নজির!

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর ২০২১  

ছবি- দৈনিক খাগড়াছড়ি।

ছবি- দৈনিক খাগড়াছড়ি।

 

একজন জনপ্রতিনিধির ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হলেও চেয়ার আঁকড়ে থাকার প্রবণতা এদেশে অহরহ। চেয়ারের ক্ষমতা শেষ হলেও সীমানা জটিলতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে অনুসারীদের দিয়ে মামলা করিয়ে চেয়ার আঁকড়ে ধরার হাজারো উদাহরণের মাঝেই দায়িত্ব শেষ হওয়ায় দায়িত্বভার হস্তান্তর করে ভারমুক্ত হওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি লিখে বিরল দৃষ্টান্ত দেখালেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার এক জনপ্রতিনিধি।

রামগড় পৌরসভার ২বারের নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ শাহজাহান (রিপন) গত ১৬ নভেম্বর মঙ্গলবার ক্ষমতা ছাড়তে চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি লিখে এ অনন্য নজির দেখালেন। 

মেয়র মোহাম্মদ শাহজাহান (রিপন) কর্তৃক স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, “গত ২০১১ সালের ২৩শে মে তারিখ অনুষ্ঠিত রামগড় পৌরসভা নির্বাচনে (৩য় পৌর পারিষদ) তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বঙ্গবন্ধু কণ্যা ও জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থার প্রতিক নিয়ে প্রথমবারের মতো পৌরবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে রামগড় পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর গত ২০১৬ সালের ২৫শে মে তারিখ অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে (৪র্থ পৌর পরিষদ) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোবাইল প্রতিকে প্রতিদ্বন্ধিতা করে পৌরবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে ২য় বারের মতো তিনি রামগড় পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন এবং বর্তমানেও মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। 

এতে তিনি উল্লেখ করেন, অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত (গত ২রা নভেম্বর) রামগড় পৌরসভা নির্বাচনে (৫ম পৌর পরিষদ) তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এর আগে চলতি বছরের ১১ আগষ্ট তারিখে ৪র্থ পৌর পরিষদের মেয়াদ শেষ হলেও উক্ত পরিষদকে বিলুপ্ত করা হয়নি। যার ফলে দায়িত্ব শেষ হবার পরেও তাকে উক্ত দায়িত্ব থেকে ভারমুক্ত করা হয় নি। 

এছাড়া, গত ২রা নভেম্বর অনুষ্ঠিত ৫ম পৌরসভা নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় মেয়র ও জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে ৯টি ওয়ার্ডে ৯জন পৌর কাউন্সিলরসহ ৩টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩জন নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের পর গত ৮ নভেম্বর খাগড়াছড়ি যুগ্ন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নির্বাচন ট্রাইবুনালে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ সাইদুর রহমানসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে, ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল বাতিল ও গেজেট স্থগিত চেয়ে সাত বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী মামলা দায়ের করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও  মামলায় মোকাবেলা বিবাদী করা হয়েছে। উক্ত মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আশঙ্কা করছেন, ইতিপূর্বে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া পৌর পরিষদের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বিলম্বিত হতে পারে। এছাড়া, শারীরিক ভাবে অসুস্থতা বোধ করায় উক্ত উত্তীর্ণ হওয়া পৌর পরিষদের দায়িত্ব পালনে তিনি বর্তমানে অপারগতা প্রকাশ করেছেন, উক্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার দ্বারা পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে ভূল-ভা্রন্তি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। 

তাই, পৌরসভা আইন অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে নবনির্বাচিত পৌর পরিষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর কিংবা প্রশাসক নিয়োগ করে তাকে উক্ত দায়িত্ব থেকে ভারমুক্ত করার জন্য তিনি চিঠির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। 

এদিকে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে প্রেরণের পাশাপাশি খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের খাগড়াছড়ির উপপরিচালক ও রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও চিঠিটির অনুলিপি প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, যেহেতেু সম্প্রতি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে নতুন পৌর মেয়রসহ পরিষদ নির্বাচিত হয়েছে সেহেতু সুষ্ঠুভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করে আমি ভারমুক্ত হতে চাই এবং নির্বাচিত পরিষদ থাকার পরেও দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকা পৌরসভার আইনের লঙ্গন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে আমি দতায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মহোদয়ের নিকট চিঠি দিয়েছি। 

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরী জানান, ক্ষমতা ধরে না রেখে হস্তান্তর করার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে বিরল। এটি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ মানসিকতার পরিচয়। এতে করে জনপ্রতিনিধিদের মাঝে ভবিষ্যতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আশা রেখে তিনি পৌর মেয়রকে শুভকামনাও জানান।

রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) উম্মে হাবিবা মজুমদার জানান, তিনি চিঠিটির একটি অনুলিপি পেয়েছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে সেটিই বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।

রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কারবারি বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। যেখানে দায়িত্ব শেষ হবার পরেও কেউ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান না, সেখানে এ বিষয়টি বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনপ্রতিনিধিদের কাছে একটি অনন্য নজির হয়ে থাকবে। 

সুশীল সমাজের লোকজন বলছেন, এদেশে ক্ষমতা আকড়ে ধরার সংস্কৃতির মাঝে পৌর মেয়রের এমন উদ্যোগ একটি অনন্য নজির হয়ে থাকবে, এমন সংস্কৃতি সারা দেশের জনপ্রতিনিধিরাও অনুসরণ করলে চেয়ারের ক্ষমতা নিয়ে হানাহানি আর বিদ্বেষ কমে আসবে শতভাগ।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]