• শনিবার   ০৬ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ২২ ১৪২৭

  • || ২১ রজব ১৪৪২

দৈনিক খাগড়াছড়ি

শহীদ মনির হোসেন দিবসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে ৪ পাহাড়ী যুবক

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি ২০২১  

ছবি- নিজস্ব প্রতিবেদক

ছবি- নিজস্ব প্রতিবেদক

 

২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি। বিচ্ছিন্নতাবাদী উপজাতীয়দের শত বাধা উপেক্ষা করে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকায় রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়। এই যাত্রাকে মেনে নিতে পারেনি পাহাড়ের উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। মেডিকেল কলেজের যাত্রার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ আনন্দ র‍্যালি বের করে। সেই র‍্যালিতে হামলা চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। আহত হন প্রায় ১৭জন শান্তিপ্রিয় নিরীহ পার্বত্যবাসী। গুরুতর আহত অবস্থায় যুবলীগ কর্মী মনির হোসেনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও ১৭ জানুয়ারি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন ।

বছর ঘুরে প্রতিবছরের ন্যায় ১৭ জানুয়ারি ফিরে আসলেও এবার সেই যুবলীগ কর্মী মনিরকে মনে রাখেনি পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন আঞ্চলিক সংগঠন। কোথাও কোন দোয়া মোনাজাত কিংবা কোন কর্মসূচী চোখে পড়েনি কারো। তবে রাজধানী ঢাকার বুকে পাহাড়ী ৪ যুবকের অভিনব মানববন্ধন ও শোক র‌্যালি চোখে পড়েছে। 

গতকাল ১৭ জানুয়ারি রবিবার ছিলো শহীদ মনির হোসেন দিবস। মনির হোসেনের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন অসংখ্য মনির হোসেনের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদ’ প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও ‘শহীদ মনির হোসেন দিবস’ পালন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে শহীদ মনির হোসেন দিবসে মানববন্ধন ও শোক র‌্যালি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদ।

মানববন্ধন ও শোক র‌্যালিতে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ মুরশীদ ত্বকী, প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন, সদস্য ইমাম হোসেন বাহাদুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন স্বতন্ত্র জোট এর ছাত্র নেতা আবির মোহাম্মদ স্বচ্ছ।  

এসময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ মুরশীদ ত্বকী, পার্বত্য চট্টগ্রামে সমস্ত জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনার জন্য সাংবিধানিক সমস্ত সুযোগ সুবিধা বিশেষত শিক্ষা, রাজনীতি ও চাকরির ক্ষেত্রে সমতা বিধান জরুরী দাবী করে শহীদ মনির হোসেনের এই ন্যায়সংগত ও সাহসী আত্নত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রয়োজনীর সকল পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ ও স্থানীয় সকল দপ্তর/প্রতিষ্ঠান/সংগঠন সমুহের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রাধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপে পার্বত্য অঞ্চলে শত বাধাবিপত্তির মাঝেও যে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে তার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগোষ্ঠী চিরকৃতজ্ঞ বলেও জানান।

বক্তারা বলেন, অপার সম্ভাবনাময়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের কর্মসূচি বাংলাদেশ সরকার যখনই হাতে নেয় তখনই একটা গোষ্ঠী বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাধা শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয় । সড়ক যোগাযোগ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সামাজিক অগ্রগতি সব ক্ষেত্রেই বাধা দান করে এই গোষ্ঠী। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ও তারা বাধা দিয়েছিল। ওই অঞ্চলের মানুষকে আধুনিকতা ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে তাদের দমিয়ে রেখে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার করে ত্রাস সৃষ্টি করে রাখাই এদের মূল উদ্দেশ্য বলে মনে হয়।

জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম এবং একমাত্র মেডিক্যাল কলেজ রাঙ্গামাটি মেডিক্যাল কলেজ। রাঙ্গামাটিতে কলেজটি যাতে প্রতিষ্ঠা হতে না পারে সেজন্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এবং তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তুমুল আন্দোলন শুরু করে। অন্যদিকে রাঙ্গামাটি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে ভিবিন্ন কর্মসূচি পালন অব্যাহত রাখে বাঙালি সংগঠনগুলো। এ অবস্থার মধ্যেই মেডিক্যাল কলেজটির কার্যক্রম শনিবার (২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি) উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।

সেদিন রাঙ্গামাটি মেডিক্যাল কলেজ উদ্বোধন ঠেকাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু লারমা সমর্থিত সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)’র বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর সমাগম ঘটায় রাঙ্গামাটি শহরে। অন্যদিকে মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধে সকল ধরনের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন অনুষ্ঠান সফল করতে মাঠে নামে জেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতকর্মীরা। শহরের কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় পিসিপি’র নেতাকর্মীরা ব্যারিকেড দিয়ে সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়, একপর্যায়ে গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। আশেপাশের ভবনগুলোতেও তারা হামলা করে বসে। এসময় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা সদর হাসপাতালের সামনে অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত স্থানে যেতে চাইলে পিসিপি’র নেতাকর্মীরা চাপাতি, রাম-দা, গুলতিসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসার পর দেখা যায়, পিসিপি’র নেতাকর্মীদের হামলায় ৪ সংবাদকর্মীসহ ১৭ জন আহত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের কিছু আগে ৯টার দিকে শহরের কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মো. শামসুল আরফিন।

এ ঘটনায় আহত যুবলীগের কর্মী মনির হোসেন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ জানুয়ারি রাতে মারা যায়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় মনির হোসেনকে মারধর শুরু করলে সে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য সেখানকার নির্মাধীন একটি ভবনের দু’তলায় উঠে যায়। সন্ত্রাসীরা তার পিছু নিয়ে সেখান থেকে তাকে নিচে রাখা নির্মাণ সামগ্রীর উপর ফেলে দেয়। এতে তার পুরুষাঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে প্রথমে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নেয়া হয়, পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে ১৭ জানুয়ারি রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আরো উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ১৩ অক্টোবর এই মনির হোসেনের বাবাকেও নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিল পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। 

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর হোসেন ও খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের প্রভাষক মোঃ জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সংগঠনটির পথচলা শুরু হয়। উক্ত সংগঠনে বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’র আইপিই বিভাগের ছাত্র মোঃ মহিউদ্দিন সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র মোঃ মিনহাজ তৌকি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ত্রান ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহা-পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) আবু সৈয়দ মোঃ হাশিম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের প্রকল্প পরিচালক (উপ-সচিব) মোঃ মনির হোসেন, বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর হোসেন, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের প্রভাষক মোঃ জাকির হোসেন, চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আরাফাতুর রাকিবসহ অন্যান্যরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।