• বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ১ ১৪২৮

  • || ০১ রমজান ১৪৪২

দৈনিক খাগড়াছড়ি

পাহাড়ে চরম মাত্রায় চাঁদাবাজির পর টাকাও আত্নসাৎ

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ২২ মার্চ ২০২১  

ছবি- সংগৃহিত।

ছবি- সংগৃহিত।

পাহাড়ের পার্বত্যঞ্চলে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে পাহাড়বাসী। হাঁস-মুরগী থেকে শুরু করে সকল প্রকার পন্যসহ এখানকার কাঠ ব্যবসা থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে আসছে এখানকার আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। বছর বছর ক্রমবর্ধমান চাঁদার হার বৃদ্ধি এবং ইহা পরিশোধ করতে গিয়ে হাপিয়ে উঠেছে পার্বত্যবাসি।

চাদাঁবাজদের হাত থেকে প্রার্ন্তিক জনগোষ্ঠির কেউ-ই রক্ষা পাচ্ছে না। এই চাদাঁবাজির কারনেই পাহাড়ে আধিপত্যের লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে প্রতিনিয়ত এখানে বন্দুক যুদ্ধ, খুন-অপহরনের মতো ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। প্রায় প্রতিদিন-ই পাহাড়ের কোথাও না কোথাও অপহরণ-খুন-চাদাঁবাজির মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে।

প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর পার্বত্য চট্টগ্রামে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির কারনেই প্রতিনিয়ত এখানে স্বশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে পাহাড়ি সংগঠনগুলো। ভাতৃঘাতি সংঘাতে এই পর্যন্ত হাজারো পাহাড়ি প্রাণ হারিয়েছে অত্রাঞ্চলে। তাই এখানকার আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ও সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর বেপরোয়া চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে রুখে দাড়িয়েছে ব্যবসায়ি থেকে শুরু করে সাধারণ জনসাধারণ।

সম্প্রতি, পাহাড়ে দুষ্কৃতকারীদের চাঁদাবাজি ও হয়রানিতে চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের ঠিকাদাররা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে চাঁদা না দিলে প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ খাদ্য পরিবহণ ঠিকাদার সমিতি ও তিন পার্বত্য জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক পরিবহণ ঠিকাদার (খাদ্য) ফেডারেশনের নেতারা এমন অভিযোগ করেছেন। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও হয়রানির কথা উল্লেখ করে সংগঠন দুটি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক বরাবরে চিঠি দিয়েছে। চাঁদাবাজি ও হুমকি-ধমকির কারণে পাহাড়ে খাদ্যশস্য পরিবহণ এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। এ কারণে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ কমে যাচ্ছে। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও হয়রানির প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে খাদ্যশস্য পরিবহণ বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ খাদ্য পরিবহণ ঠিকাদার সমিতি। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, মহালছড়ি, পানছড়ি ও রাঙ্গামাটির লংগদু, বাঘাইছড়িতে খাদ্যশস্য পরিবহণ বন্ধ রাখা হয়।

বাংলাদেশ খাদ্য পরিবহণ ঠিকাদার সমিতির নেতারা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে পাহাড়ি দুষ্কৃতকারীরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ ঠিকাদার ও বান্দরবান জেলা অভ্যন্তরীণ সড়ক পরিবহণ ঠিকাদার (খাদ্য) ফেডারেশনের ঠিকাদারদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক ও মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছে। স্বেচ্ছায় চাঁদা না দেওয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, মহালছড়ি, পানছড়ি ও রাঙামাটির লংগদু, বাঘাইছড়ি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যবাহী ট্রাক আটকে রেখে দুষ্কুতকারীরা ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা না পেলে খাদ্য পরিবহণে ভি-ইনভয়েস ছিনিয়ে নিয়ে চালককে মারধর এবং পণ্যবাহী ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করা হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছিল না। নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে খাদ্য পরিবহণ সমিতি সাধারণ জনগণের জন্য খাদ্যশস্য পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু হয়রানি ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে খাদ্য পরিবহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পার্বত্যাঞ্চলে বাসিন্দা পাহাড়ি ও বাঙালি দুই পক্ষই বলছে, বাগান করতে, গাড়ি চালাতে, পণ্য বিক্রি করতে, সব কিছুতেই চাঁদা দিতে হয়। এমনকি শান্তি চুক্তির বর্ষপূর্তি উদযাপনের অনুষ্ঠানের জন্যও চাঁদা চাওয়া হয়। এই চাঁদাবাজিতে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বাঙালিরাও জড়িত। পার্বত্যাঞ্চলে ৩০ বছর কর্মজীবন পার করে গত বছর অবসর নিয়ে বান্দরবানে স্থায়ী হওয়া আব্দুল হাই বলেন, “চাঁদার জন্য আধিপত্য, আর এই আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যত হত্যাকাণ্ড ও অশান্তি।” চাকরি জীবনে চাঁদা দিয়েছেন কি না- জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, দীঘিনালা, তবলছড়ি, তাইডং, গুইমারা, মারিশ্যা, পানছড়ি এসব এলাকায় চাকরিজীবীদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। শান্তিচুক্তির আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে বললে তিনি বলেন, “তখন সন্ধ্যার পর চলাচল করা যেত না, এখন রাতে চলাচল করা যায়। তবে এখন চাঁদাবাজি বেড়েছে। আঞ্চলিক দলগুলো বিভক্ত হয়ে খুন বেশি হচ্ছে।” অবসর জীবনে কলা ও কাঁঠাল বাগান করছেন আব্দুল হাই। তার কাছেও ফোনে চাঁদা চাওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পার্বত্য তিন জেলার ‘একমাত্র সমস্যা’ চাঁদাবাজি।

এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পাহাড়ে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করতে এবং ভূমি দখলসহ পার্বত্য অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের রাখতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার ও মজুদ করছে পার্বত্য অঞ্চলের চারটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন।” 

অস্ত্রধারীদের হাতে পার্বত্যবাসী জিম্মি হয়ে আছে। এসব সংগঠন মুখে পার্বত্যবাসীর অধিকারের কথা আওড়ালেও প্রকৃতপক্ষে এরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। দরিদ্র পাহাড়িরা একটি ডিম বিক্রি করলেও এদেরকে চাঁদা দিতে হয়। প্রতি বছর তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো প্রায় চারশো‘ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। খাগড়াছড়ির কয়েকটি এলাকা ঘুরে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে কৃষিজীবী থেকে চাকরিজীবী, শ্রমজীবী থেকে ব্যবসায়ী—সবাইকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদা দিয়ে যেতে হচ্ছে বছরের পর বছর। 

খাগড়াছড়ির পানছড়ি, দীঘিনালা ও সদরের কয়েকটি এলাকায় নানা শ্রেণি-পেশার অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি তাঁদের ওপর চাঁদাবাজির চাপ সম্পর্কে জানান। একজন পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, চাঁদা দিতে কখনো একটু দেরি হলেই যানবাহন আটকে রাখা থেকে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। কিছুদিন আগে একই কারণে একটি ট্রাক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ। ছাত্র, যুব, নারী সংগঠনসহ এই দলের শাখা-প্রশাখা প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও তাদের সম্পর্কেই সবচেয়ে বেশি। তারা চাকরিজীবীদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা নেয়। কৃষিজীবীদের কাছ থেকে মৌসুম ভিত্তিতে এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় চাঁদা সংগ্রহ করে। চাঁদার অর্থ দিয়ে দল পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে দলের কর্মসূচি পালন, দলের সার্বক্ষণিক নেতা-কর্মীদের ভাতা প্রদান, বিভিন্ন কেনাকাটা প্রভৃতি সব খরচই অন্তর্ভুক্ত। অভিযোগ হচ্ছে, এই চাঁদার হার অত্যধিক। 

এদিকে, গত ২০ মার্চ সন্ধ্যায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের একোইজ্জাছড়ি নামক এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই ব্যাবসায়ী আহত হয়েছেন। জানা যায়, আহত মুদি ব্যবসায়ী হলেন মিজান (৩২) ও সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসায়ী মোঃ সাগর (৩৫) সাজেক হতে মোটর সাইকেল যোগে বাঘাইহাট আসার পথে একোইজ্জাছড়ি নামক এলাকায় পৌছালে চাঁদার দাবীতে হঠাৎ তাদের উপর শর্টগানের ফায়ার করে সন্ত্রাসীরা, এতে দুইজন আহত হয়। এসময় তাদের কাছে নগদ অর্থ লুটে নেয় সন্ত্রাসীরা।

এছাড়া, পার্বত্য খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় চাঁদার দাবিতে ট্রাক শ্রমিকদের উপর হামলা করেছে স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় তিন শ্রমিক আহত হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারির ১৩ তারিখে দুপুরের দিকে দীঘিনালা-লংগদু সড়কের চৌধুরী পাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লংগদু খাদ্য গুদামে চাল নিয়ে যাওয়ার পথে ট্রাকটি দীঘিনালা-লংগদু সড়কে চৌধুরীপাড়া এলাকায় পৌছানোর পর সন্ত্রাসীরা চাঁদার দাবি করে। এসময় দাবীকৃত চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শ্রমিকদের উপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এসময় ট্রাক চালক মো. হানিফ মারাত্মকভাবে আহত হয়। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা চলে গেলে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে।

অন্যদিকে, চাঁদা না পেয়ে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (১৭ নভেম্বর) রাত ২ টার দিকে পানছড়ির মরাটিলা এলাকায় ফেনী থেকে পানছড়িগামী পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনার জন্য পানছড়ি বাজারের ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করছে। ব্যবসায়ীরা জানান, পাহাড়ের আঞ্চলিক দুই সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের জেরে ইউপিডিএফ এর হুমকিতে গত ২০ মে থেকে পানছড়ি বাজারে আসতে পারছে না স্থানীয় পাহাড়িরা। একই সঙ্গে বাজারে পণ্য পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সংগঠনটি। ইউপিডিএফ’র কর্মীরাই পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দিয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

এর আগেও, ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি রাঙামাটির নানিয়ারচরের কেঙ্গালছড়ি এলাকায় পণ্যবাহী দুইটি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করেছিল দুর্বৃত্তরা।

এছাড়া গতবছরের ১৫ মে খাগড়াছড়িতের চাঁদা না পেয়ে কৃষকের ৫ হাজার আনারস গাছ কেটে দিয়েছে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। খাগড়াছড়ির গুইমারার হাফছড়ি ইউনিয়নের হাতিমুড়া এলাকার দক্ষিণ ফকির নালায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। আনারস বাগানের মালিক কৃষক ডালিম মিয়া অভিযোগ করেন, “কয়েকদিন ধরে আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ-এর স্থানীয় নেতা দুর্জয় চাকমা চাঁদা দাবি করে আসছিল। দুই সপ্তাহ আগে ২ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। পুনরায় টাকা দাবি করলে তা দিতে রাজি না হওয়ায় রাতের আঁধারে প্রায় ৫ হাজার আনারস গাছ কেটে ফেলেছে।” এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তিনি। 

একই বছরের ২৮ আগষ্ট খাগড়াছড়ি-পানছড়ি জেলা সড়কের দেওয়ান পাড়া এলাকায় রাত ৮টায় এক চাঁদা আদায়কারীকে গ্রেফতার করেছে বিজিবি। এ সময় চাঁদাবাজরা বিজিবি সদস্যদের লক্ষ করে গুলি ছোঁড়ে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি সদর থানায় ১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানায় শুক্রবার রাতে পানছড়ি ৩ বিজিবি’র ৩১ জন সদস্য শান্তি পরিবহন করে ছুটিতে যাওয়ার সময় খাগড়াছড়ি সড়কের দেওয়ান পাড়ায় পৌঁছালে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের দুইজন চাঁদাবাজ মোটরসাইকেল যোগে পিছন থেকে দ্রুত গতিতে বাসটির সামনে গিয়ে বাসের গতিরোধ করে। এর মধ্যে একজন বাসটিতে উঠে তাদের সিগনাল অমান্য করার অভিযোগ তুলে বাসের ড্রাইভারকে গালমন্দ, কিলঘুষি ও তাদের চাঁদার বাৎসরিক রশিদ দেখাতে বলে অন্যথায় ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এসময় কথাকাটাকাটির ফাঁকে বিজিবি’র সদস্যরা তাকে ধরে ফেলে। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে অপর সহযোগী বাসটিকে লক্ষ করে বেশ কটি গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যায়। আটককৃত চাঁদাবাজ রোমান্ত চাকমা অনিয়ন পানছড়ি উপজেলার লতিবান ছড়া (অরনিপাড়া) এলাকার বরগুনা গ্রামের ধনঞ্জয় চাকমার ছেলে পরে জানা গেছে।

এছাড়া চাঁদার দাবিতে পাহাড়ে অহরহ ঘটছে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা অপকর্ম। এসব চাঁদার টাকায় সন্ত্রাসীরা পাহাড়ে শক্তিশালী অস্ত্রের মজুদও গড়ে তুলছে। 

এছাড়া চাঁদাবাজির এসব টাকা জুম্ম জনগনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যয় করার কথা বলা হলেও মূলত এসব চাঁদাবাজির টাকায় আরাম-অঅয়েশি জীবন যাপন করছে ইউপিডিএফ ও জেএসএসর প্রথম সারীর নেতারা। বিনিময়ে কর্মীরা প্রায় কোন ধরণের সুবিধাই পান না। এসব বিষয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসছে ভয়ঙ্কর তথ্য।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়েও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা। সম্প্রতি রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে মগবানে চাঁদার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের গুলিতে ১ জন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম বিক্রম চাকমা(৪০)। সে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কর্মী বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁদার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে বিক্রম চাকমা নামে জনসংহতি সমিতির এক সদস্য প্রতিপক্ষের গুলিত নিহত হয়েছেন। গুলি করে হত্যাকারীরা জঙ্গলে পালিয়ে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা। 

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্তু লারমার সশস্ত্র দলটির মধ্যে নানাপ্রকার অব্যস্থাপনা শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। দলের কেউ কেউ সন্তু লারমার ছত্রছায়ায় থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছেন। উদাহরণ স্বরুপ: জ্ঞান শংকর চাকমা, যাকে র‌্যাব গত ১৮ মার্চ তারিখে বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের হত্যাকান্ডের অন্যতম আসামী হিসেবে প্রাথমিক ভাবে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে সে নিহত হয়। রাঙ্গামাটিতে জনশ্রুতি রয়েছে যে, এই জ্ঞান শংকর চাকমা দলকে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেছে।

সম্প্রতি, খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও নিজেদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ সমর্থিত অঙ্গ সংগঠন উইমেন্স ফেডারেশন। উপিডিএফ (প্রসীত) মদদপুষ্ট হিল উইমেন্স ফেডারেশন চাঁদার টাকায় উপজাতি মহিলাদের ভাড়া করে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে সংগঠনটি। সমাবেশের লক্ষ্যে জড়ো হওয়ায় মহিলাদের মাথাপিছু ৫শ করে টাকা দিয়েই তাদের সেখানে নিয়ে আসা হয় এবং সেখানে উপস্থিত মহিলারা প্রত্যেকেই দূর্গম পাহাড়ের নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষ। 

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সমাবেশে আসা কয়েকজন সাধারণ উপজাতি মহিলা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, উক্ত কর্মসূচিকে পালন উপলক্ষ্যে হিল ইউমেন্স ফেডারেশন ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর নিকট হতে চাঁদাবাজির ৫ লক্ষ টাকা পায়। তন্মধ্যে ব্যানার তৈরিতে খরচ করে ১৮, ২৫০ টাকা এবং মিছিলে ভাড়াকৃত উপজাতি মহিলাদের জন প্রতি ৫০০ টাকা করে প্রদান করে, এতে খরচ হয় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। বাকী টাকা হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি এন্টি চাকমা আত্মসাৎ করেছে বলে জানান তারা। চাঁদাবাজির এই অর্থ আত্মসাৎকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির কয়েকজন নেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনটির একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী বলেন, "চাঁদাবাজির টাকায়ও চুরি ভাবা যায়?"

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]