• বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ১ ১৪২৮

  • || ০১ রমজান ১৪৪২

দৈনিক খাগড়াছড়ি

চাঁদাবাজির কবলে পড়ে থমকে যাচ্ছে পাহাড়ের উন্নয়ন কাজ

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২১  

ছবি- সংগৃহিত।

ছবি- সংগৃহিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানকে সারাদেশের মতো সমন্বিত উন্নয়নের কাতারে নিয়ে আসতে নানামুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বর্তমান সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের গ্রাম হবে শহর প্রকল্পে প্রতিবছর শত-কোটি টাকার কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে এই তিন পার্বত্য জেলায়। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পিছিয়ে থাকবেনা পাহাড়ী জনগোষ্ঠীও, ফারাক থাকবেনা রাজধানী ও পাহাড়ের মধ্যে। কিন্তু সরকারের এসব উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ে সশস্ত্র আঞ্চলিক উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ‘চাঁদাবাজি’। এসব আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে চাঁদাবাজির শীর্ষে রয়েছে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস। 

চাঁদার দাবিতে এসব সশস্ত্র আঞ্চলিক উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বাঁধার মুখে ইতিপূর্বে অনেক উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, এমনকি বর্তমানেও বান্দরবানের চন্দ্রপাহাড়ে সরকারের একটি ইকো পর্যটন পরিকল্পনাও এসব আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মুখে থমকে আছে।

জানা যায়, পাহাড়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের উন্নয়ন কাজ যেমন, এলজিইডি, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য মন্ত্রনালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা সহ রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট, এমনকি স্কুল-কলেজ ও মসজিদ-মন্দির নির্মানেও চাঁদা দিতে হয় পাহাড়ের চারটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনকে। 

নির্ধারিত কাজে পার্সেন্টিজ আকারে চাঁদা না দেয়া হলে এসব সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে বন্ধ করে দিচ্ছে উন্নয়ন কাজ, এমনকি চাঁদার দাবিতে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারসহ নির্মান শ্রমিকদের। এছাড়া কখনো কখনো নির্মান কাজে বিঘ্ন ঘটাতে গুলি করে নির্মান শ্রমিক হত্যার ঘটনাও ঘটিয়েছে এসব সন্ত্রাসীরা। 

সূত্র জানায়, বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে চলা অন্তত ৬টি প্রকল্পে চাঁদার দাবিতে নির্মান কাজ বন্ধ করে দিয়েছে প্রসীত পন্থি ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা।

এছাড়া, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলাধীন পানছড়ি উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে এলজিইডি, জেলা পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদের আওতাধীন বিভিন্ন  স্কুল, কলেজ, ব্রীজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাটসহ উন্নয়ন মূলক প্রায় ৩২/৩৫ কোটি টাকার কাজ চলমান। উল্লিখিত চলমান কাজ করার জন্য উপজেলার ইউপিডিএফ (প্রসীত)  এবং জেএসএস (সন্তু) দলকে  চাঁদা দিয়ে আসতে হচ্ছে, ফলে ঠিকাদারগন কাজে ফাঁকিসহ বিলম্ব করছে বলে জানা যায়। এ কারনে ঠিকাদারগন অতিষ্ট ও  নানা ধরনের শঙ্কা এবং ভীতি নিয়েই কাজ করছে। এছাড়াও অটোরিকশা মালিক, সিএনজি মালিক, গাছ ব্যাবসায়ী, কাঠ ব্যাবসায়ীসহ বিভিন্ন যানবাহন মালিকরা দীর্ঘ দিন ধরে চাঁদা দিয়ে আসছে।

গোপন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পানছড়ির লোগাং এর বাসিন্দা ও বর্তমানে ইউপিডিএফ মূল এর সহ সংগঠক ও ক্যাশিয়ার বিকাশ চাকমা (৪৫) দুদকছড়ায় বসে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাবসায়ীদের নিকট হতে চাঁদা উত্তোলন করছেন এবং ঠিকাদাররা ভয়ে দুদকছড়ায় গিয়ে চাঁদা দিয়ে আসছে।

একটি সূত্র বলছে, উত্তোলিত এ চাঁদার টাকা ইউপিডিএফ মূল এর সামরিক কমান্ডার সমাজপ্রিয় চাকমা ওরফে প্রতীক চাকমা এর নিকট জমা হচ্ছে এবং এ অর্থ দিয়ে অস্ত্র ক্রয় এবং আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যয় করা হবে।

অন্যদিকে, জেলার রামগড়ে বৌদ্ধপাড়া ব্রীজ ও পরশুরাম ঘাট ব্রীজ, গুইমারার সিন্দুকছড়ি সড়কের কাজ, মানিকছড়ি উপজেলার বাটনা- গৈয়াপাড়া-গরুকাটা সড়কের নির্মান কাজ, মাটিরাঙ্গা উপজেলার লক্ষীছড়ায় ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্লক নির্মান প্রকল্প, পানছড়ি কলেজ থেকে নুনছড়ি-বাবুছড়া সড়ক নির্মান প্রকল্পে বিপুল পরিমন চাঁদা দাবি করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ঠিকাদাররা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্রের জোরে এসব কাজগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় নির্মান শ্রমিকরাও চলে যায়, ফলে বিপাকে পড়েছেন স্ব স্ব ঠিকাদাররা। 

এতে করে নির্ধারিত সময়ে সম্ভব হচ্ছেনা এসব উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মান কাজ। আর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানের স্বপ্ন ও পাহাড়কেও রাজধানীর কাতারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা থমকে যাচ্ছে দিন দিন। 

নির্মানকাজে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাঁদার দাবিতে কোজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প কাজ শেষ করতে না পারায় সরকারের কাছ থেকে বিল উত্তোলন করতে পারছেন না ঠিকাদাররা। বেকায়দায় নির্মান শ্রমিক ও তাদের পরিবারও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একটি নির্মান কাজের ঠিকাদার অসীম ত্রিপুরা জানান, সরকারী একটি ব্রীজের কাজে তার কাছে মুঠোফোনে তিন লক্ষ টাকা চাঁদা চায় ইউপিডিএফ। কিন্তু তিনি চাঁদা দিয়ে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ইউপিডিএফের চারজন অস্ত্রধারী এসে নির্মান কাজ বন্ধ করে দেন। এরপর ব্রীজের নির্মান কাজের সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি আর কাজ শুরু করতে পারেন নি। অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের ভয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীকেও বিষয়টি জানাতে পারছেন না তিনি। 

আরেক ঠিকাদার রুহুল আমিন মোল্লা জানান, গত বছর আগে একটি ইট সলিং রাস্তার নির্মান কাজ করার সময় সন্ত্রাসীরা এসে অস্ত্রের মুখে তার কাছ থেকে ৫০হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এসময় ইউপিডিএফের একটি গ্রুপকে তিনি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে শান্ত করতে পারলেও জেএসএস সন্ত্রাসীরা তার কাছে ১লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে, টাকা দিতে না পারায় নির্মান কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে তাকে। 

এ বিষয়ে জানতে ইউপিডিএফের খাগড়াছড়ির সংগঠক অংগ মারমাকে মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি। 

স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড সচল রাখতে ও প্রধানমন্ত্রীর গ্রাম হবে শহর প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তায় এখনি পাহাড়ে চাঁদাবাজদের দৌরাত্নে বন্ধ হয়ে যাওয়া উন্নয়ন কাজ চালু করতে হবে। তবেই এগিয়ে যাবে পাহাড়, পুরণ হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]