• শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১ ||

  • আষাঢ় ৪ ১৪২৮

  • || ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

দৈনিক খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির উচ্চশিক্ষিত এক ভুট্টা চাষীর হতাশার গল্প

দৈনিক খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ৪ মে ২০২১  

ছবি- সংগৃহিত।

ছবি- সংগৃহিত।

 

ভুট্টা চাষী জীবক চাকমা।

দুই ভাই চিকিৎসক, এক ভাই প্রকৌশলী আর দুই বোন করছেন শিক্ষকতা। তবে তাদেরই আরেক ভাই নিতান্তই একজন কৃষক। তিনি যে সাধারণ কোন কৃষক তাও নন, দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক করা একজন উচ্চশিক্ষিত কৃষিজীবি তিনি। নাম তাঁর জীবক চাকমা । বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই।

অর্ধ শতাব্দী আগে খাগড়াছড়ি’র সদর উপজেলার অজপাড়া গাঁ কমলছড়িমুখ এলাকার কৃষক দম্পতি নিবারণ চাকমা ও দীপালি চাকমার ঘরে জন্ম নেন জীবক চাকমা। আট ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম তিনি।

তাঁর শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিলো কমলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত। এরপর পারিবারিক টানাপোড়েনে চলে যান রাঙামাটির মাচালংয়ে। মাচালং উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে মাধ্যমিক পাস করেন জীবক চাকমা। পরে ভর্তি হন রাঙামাটি সরকারি কলেজে। ১৯৮৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র। ১৯৯৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। এরপরই পুরোদস্তর মনোযোগী হন কৃষিকাজে। সেই থেকে এখন অব্দি দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন বাবা-দাদার প্রাচীন পেশা।

মূলত বাবা এবং মা’ই তাঁর কৃষিকাজের অনুপ্রেরণা। কৃষিজীবি পিতা-মাতা এই পেশার মাধ্যমেই তাদের আট ভাইবোনের পড়াশুনাসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয় মিটিয়েছেন। সন্তানদের সবাইকে করেছেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। জীবক চাকমার ভাইবোনদের সকলেই আজ নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ভাইবোনদের মধ্যে সুভাশিষ চাকমা ও কৌশিক চাকমা চিকিৎসক, রত্ন চাকমা প্রকৌশলী, তুষিতা চাকমা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ও বেণু চাকমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তবে এদের সকলের চেয়ে চিন্তায় ও মননে জীবক কিছুটা অন্য কিংবা অনন্য ছিলেন। দেশখ্যাত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও বেছে নিলেন কৃষিকাজ। আর এই কৃষিকাজ করেই স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং বাবা-মাকে নিয়ে শান্তির সংসার তাঁর।

শৈশব থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি বাবাকে শ্রম ও সঙ্গ দিতেন জীবক চাকমা। সেই থেকেই পিতার পেশা ও কৃষি কাজের সাথে প্রণয়ের সূচনা। একটু ফুসরত পেলেই বাবার সাথে কাজে নেমে পড়তো কিশোর, বালক কিংবা যুবক জীবক চাকমা। শিক্ষা জীবন শেষে তাই আর অন্য পেশা টানেনি তাকে। ফিরে এসেছেন পৈতৃক ভূমিতে কৃষকের বেশে। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশী এই কৃষক জীবনে বলা চলে সফলই ছিলেন তিনি। তবে শেষ বয়সে এসে তাকে বিপত্তি বাঁধলো হালের করোনা। সারাদেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতেও পড়েছে কোভিড-১৯ এর বিরূপ প্রভাব। লকডাউনের কারণে অন্যান্য কৃষিজীবিদের মতো জীবক চাকমাও পড়েছেন লোকসানে।

জীবক চাকমার বাড়ির আঙিনায় শুকানো হচ্ছে ভুট্টা।

পৈতৃক জমিতে বরাবারের মতো এবারও তিনি বোরো ধান, ভুট্টা, আলু, টমেটো, বেগুন, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, লাউ ও ঢেড়সের চাষাবাদ করেছেন। এরমধ্যে সবচে বেশী হলো ভুট্টার আবাদ। এ বছর ৬ একর জমিতে মন্টা টু-৯৮১, মন্টা টু-৯১২০ ও টিপি ৮৩৮ এই তিন জাতের ভুট্টার আবাদ হয়েছে তাঁর। যদিও গেলো বছরে আরও বেশী পরিমাণ জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছিলেন। তবে লকডাউনের প্রভাবে গতবছর লোকসানে পড়ায় এবারে আবাদের পরিসর কিছুটা কমিয়ে এনেছেন তিনি। তবুও ফের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁকে।

জীবক চাকমা বলেন, ‘প্রতি একরে প্রায় দেড় মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদন হয়। তবে করোনার কারণে এই দু’বছর টানা লোকসানে পড়েছি। আগে যেখানে প্রতি টন ভুট্টা পাইকারি বিক্রি হতো ২২-২৫ হাজার টাকায়, সেখানে বর্তমানে প্রতি টন ভুট্টার পাইকারি দর ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকা।’

জীবক চাকমার ভুট্টাখেতে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। প্রাত্যহিক ৩ থেকে ৪’শ টাকা হারে মজুরী দিতে হয় তাদের। উৎপাদনের আনুষাঙ্গিক ব্যয় বাদ দিয়ে বর্তমানে লাভ তো হচ্ছেই না বরং গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের ভর্তুকী। জীবক চাকমার সারা জীবনের হিসেব নিকেষকে উল্টে দিলো অদৃশ্য এক ভাইরাস। দীর্ঘ দুই যুগের সফলতা ম্লান হচ্ছে নিমিষেই। বার্ধক্যলগ্নে এসে দিনে দিনে ঘনীভূত হচ্ছে হতাশার কুয়াশা।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মর্ত্তুজ আলী জানান, ‘গত বছরের দর পতনের ফলে এবার জেলায় ভুট্টার আবাদ কিছুটা কমে এসেছে। এ বছর খাগড়াছড়ি জেলার নয় উপজেলার মোট ৪৭২ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছেন চাষীরা। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৪’শ ৫০ মেট্রিক টন।’

জেলার সবকটি উপজেলাতেই কম-বেশী ভুট্টার আবাদ করা হয়। তবে এরমধ্যে দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি সদর ও মাটিরাঙা উপজেলায় আবাদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশী। জেলার সকল ভুট্টা চাষীরা গতবারের মতো এবার পড়েছেন লোকসানের কবলে। সরকারের কাছে প্রণোদনার প্রত্যাশা তাদের।

সূত্র: তৃতীয় দৃষ্টি।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের। এছাড়া যেকোনো সংবাদ বা অভিযোগ লিখে পাঠান এই ইমেইলেঃ [email protected]